প্যারাডাইস লস্ট সারাংশ - Summary of Paradise Lost by John Milton

 প্যারাডাইস লস্ট ইংরেজ কবি জন মিল্টন [জন্ম ৯ ডিসেম্বর ১৬০৮ এবং মৃত্যু ৮ নভেম্বর ১৬৭৪ (বয়স ৬৫), ইংল্যান্ড] রচিত মহাকাব্য। এটি ১৬৬৭ সালে প্রকাশ করা হয়। জীবনের শেষ দিকে তিনি দরিদ্র ও অন্ধ অবস্থায় কাব্যের সংলাপ বলতেন আর তার মেয়েরা কেউ একজন লিখে দিত।


প্যারাডাইস লস্ট'র চরিত্র পরিচিতি


প্যারাডাইস লস্ট মহাকাব্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রয়েছে। এ কাব্যের মূল কাহিনী সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়ার জন্য চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। তো চলুন এখন আমরা প্যারাডাইস লস্ট মহাকাব্যের চরিত্রগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।

গড দা ফাদারঃ
গড দা ফাদার বলতে এ এই মহাকাব্যে বিশ্ব জগতের সৃষ্টিকর্তাকে বুঝানো হয়েছে ।

শয়তানঃ
শয়তান হলো এ মহাকাব্যের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। শয়তানের প্রকৃত নাম লুসিফার। সে প্রাথমিক পর্যায়ে ফেরেশতাদের মধ্যে অত্যন্ত সম্মানিত এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিল । কিন্তু একসময় এসে সে তার ক্ষমতা,দক্ষতা ,যোগ্যতার বড়াই করে অত্যন্ত অহংকারী হয়ে ওঠে এবং সে নিজেকে ঈশ্বরের সমপর্যায়ে ভাবতে থাকে এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে। যার ফলশ্রুতিতে মহান সৃষ্টি কর্তা শয়তান এবং তার সঙ্গী সাথীদের স্বর্গ থেকে অপসারিত করেন। ঈশ্বর শয়তানের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করলে সে ঈশ্বরের প্রতি অনুতপ্ত না হয়ে বরং গড দা ফাদারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় যে, যে মানবজাতির জন্য সে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছে সেই মানবজাতিকে সে অবশ্যই পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে।

সান অফ গডঃ
খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল অনুযায়ী সন অফ গড হলেন যিশুখ্রিস্ট । জন মিল্টন এ মহাকাব্যে যীশু খ্রীষ্টকে শান্তির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আদমঃ
আদম এ পৃথিবীর প্রথম মানব যাকে গড দা ফাদার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং উচ্চতর মর্যাদা প্রদান করেছেন। আদম থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন।

ইভঃ
ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী ইভ হল পৃথিবীর প্রথম নারী এবং আদমের স্ত্রী । তাকে আদমের বাম পাজরের হাড় থেকে তৈরি করা হয়েছে

বেলজিবাবঃ
বেলজিবাব হল শয়তানের অত্যন্ত অনুগত সহযোগী। সে সর্বদা শয়তানের পাশে অবস্থান করে এবং শয়তানকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ইন্ধন যোগাতে থাকে যার ফলশ্রুতিতে শয়তানের সঙ্গে সে নিজেও স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়।

সিনঃ
সিন এ মহাকাব্যের অন্যতম একটি চরিত্র। সে মূলত শয়তানের মেয়ে। সে আদম এবং ইভকে ফ্রুট অফ নলেজের ফল খাওয়ানোর ক্ষেত্রে শয়তানকে নানাভাবে সাহায্য করে।

ডেথঃ
ডেট হলো শয়তানের পুত্র । শয়তান তার আপন মেয়ের সিনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করার ফলে এই ডেথের জন্ম হয় । আদম এবং ইভকে ধোকা দেওয়ার জন্য শয়তান যখন তাদের কাছে যেতে চায় তখন সিনের মত ডেথ ও শয়তানকে ব্যাপকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে।

গাব্রিলঃ
ঈশ্বরের কর্মে নিয়োজিত একজন অনুগত ফেরেশতা গাব্রিল। সে স্বর্গ থেকে ইডেন পর্যন্ত পৌঁছার যে সিঁড়ি রয়েছে সেটির পাহারাদার দায়িত্ব নিয়োজিত।

রাফেলঃ
রাফেল ঈশ্বরের পক্ষ থেকে তথ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত । শয়তান যখন আদম এবং ইভকে ইডেনে নানাভাবে পরোচিত করছিল তখন সে ঈশ্বরের পক্ষ থেকে আদমকে সতর্ক করে এবং শয়তানের কথায় কর্ণপাত না করার পরামর্শ দেয়।

আরিয়েলঃ
আরিয়েল একজন ফেরেশতা। সে ইডেনের বাগানের পাহারাদার । সে সর্বদা স্বর্গের বাগান পাহারা দেয় এবং স্বর্গের বাগানে অবাঞ্ছিত কেউ যেন প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে সর্বদা প্রস্তুত থাকে।

মাইকেলঃ
মাইকেল ঈশ্বরের সেনাপতি। সে ঈশ্বরের নির্দেশে আদম এবং ইভকে ইডেনের গার্ডেন থেকে দুনিয়ার বুকে নিক্ষেপ করে। সে এর মহাপ্রবণের ঘোষণা দেয়।


প্যারাডাইস লস্ট'র সারাংশ


একঃ ঈশ্বরের সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা
লুসিফার তথা শয়তানের আত্ম অহংকারের মধ্য দিয়ে প্যারাডাইস লস্ট এ মহাকাব্যটির মূল কাহিনীর সূত্রপাত হয়। কেননা শয়তান তার প্রাথমিক জীবনে এঞ্জেলদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিল। সে তার ক্ষমতার দাপটে একপর্যায়ে নিজেকে স্রষ্টার সমতুল্য ভাবতে শুরু করে। যদিও শয়তান নিজেও জানতো সে কখনোই স্রষ্টার সমতুল্য হতে পারবে না কিন্তু সে নিজেকে স্রষ্টার সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। তার কামনা বাসনা পূরণের লক্ষ্যে সে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শয়তান ভাবে সে যদি ঈশ্বরের সঙ্গে বিদ্রোহ করে তাহলে ঈশ্বর তাকে ইডেন থেকে নির্বাসিত করবে তখন সে তার নিজের মতো করে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হবে । আর সেই রাজ্যের সর্বময় ক্ষমতার মালিক হবে শয়তান। কেননা শয়তান বিশ্বাস করে, স্বর্গে অন্য কারো অধীনস্থ হয়ে থাকার চেয়ে নরকে স্বাধীন বা রাজা হয়ে থাকা অনেক শ্রেয়। সুতরাং শয়তান তার কতিপয় সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং ঈশ্বর তাদেরকে ইডেন তথা স্বর্গ থেকে নির্বাসিত করে এবং নরকে নিক্ষেপ করে। নরকে গিয়ে শয়তান তার সঙ্গী সাথীদের মধ্যে নিজেকে নরকের রাজা হিসেবে ঘোষণা করে এবং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

দুইঃ আদম এবং ইভকে ধোকা দেওয়ার ষড়যন্ত্র
শয়তান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে নরকে গিয়ে তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে প্যান্টামোনিয়াম নামক স্থানে একটি সভার আয়োজন করে। তাদের মিটিং এর উদ্দেশ্য ছিল কিভাবে তারা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। তাদের আলোচনার এক পর্যায়ে শয়তান সেখানে উপস্থিত নরকের অন্যান্য সঙ্গী-সাথীদের বলে ঈশ্বর সম্প্রতি মানুষ নামে একটি নতুন জাতির সৃষ্টি করেছে এবং স্বর্গের বাগানে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছে । তারা সেখানে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে যা ইচ্ছা খাচ্ছেএবং পান করছে। সুতরাং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অংশ হিসেবে আমাদের প্রধান কাজ হবে স্বর্গ থেকে এই মানবজাতিকে বিতাড়িত করার ব্যবস্থা করা। আমরা যদি এই মানুষ জাতিকেকে ধোকা দিয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করার ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে এটাই হবে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামের বিজয় । তবে এক্ষেত্রে শুকৌশলে মানবজাতিকে ঈশ্বরের হুকুমের বিপক্ষে কাজ করাতে হবে। আর যখন তারা ঈশ্বরের হুকুমকে অমান্য করবে তখন ঈশ্বর তাদেরকে শাস্তি হিসেবে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করবেন আর যা হবে আমাদের মহা বিজয়। শয়তানের সকল কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে তার সঙ্গী সাথীদের সকলে শয়তানের সাথে একত্রে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতি বন্ধ হয় ।


তিনঃ কুমন্ত্রণার উদ্দেশ্যে শয়তানের যাত্রা
এরপর শয়তান তাদের আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদম এবং ইভকে কুমন্ত্রণা দেওয়ার জন্য স্বর্গের উদ্দেশ্যে রওনা হয় কিন্তু সে স্বর্গের বাগানের কাছে গিয়ে দেখে ইউরিয়েল নামক একজন পাহারাদার বাগানের গেট পাহারা দিচ্ছে ।সে বারংবার অনুরোধ সত্বেও আরিয়েল শয়তানকে ইডেনের বাগানে প্রবেশ করতে দেয় না।একপর্যায়ে সে তার অবৈধ সন্তান ডেথ এবং তার মেয়ে সিনের সাহায্য নিয়ে ইউরিলকে ধোকা দিয়ে ইডেনের বাগানে প্রবেশ করে। ইডেনের বাগানে প্রবেশ করে বাগানের সৌন্দর্য দেখে সে অত্যন্ত বিমোহিত হয়ে যায় । সে আদম এবং ইভকে স্বর্গের বাগানে অনন্ত সুখ স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে দেখে তাদের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে এবং ভাবে যে করেই হোক না কেন সে এই আদম এবং ইভকে স্বর্গের বাগান থেকে বিতাড়িত করবেই করবে।

চারঃ আদম এবং ইভকে ধোকা দেওয়ার পথের অনুসন্ধান
এরপর শয়তান বেহেস্তের ইডেনের এদিক সেদিক ঘুরতে থাকে এবং কিভাবে আদম এবং ইভকে ধোঁকা দেওয়া যায় তারপথ খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে সে আদম এবং ইভকে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে দেখে এবং সে ওত পেতে থেকে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করে। সে সময় আদম এবং ইভ বলছিল যে বেহেস্তের বাগানের যত কিছু রয়েছে সবকিছুই সৃষ্টিকর্তা আমাদের ভোগ দখল করার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র ফ্রুট আপ নলেজ এই বৃক্ষটির ফল খেতে, এর নিকটে যেতে বারণ করেছে এ বিষয়টি আসলে আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তবে আমরা কোনভাবেই ঈশ্বরের আদেশের বাহিরে কোন কাজ করব না। শয়তান এ কথাটি শ্রবন করার পর আদম ইভকে প্ররোচিত করার একটি পথ খুঁজে পায় এবং মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, সে যে করেই হোক আদম এবং ইভকে ফুট অফ নলেজের ফল খাওয়াবে এবং তাদেরকে স্বর্গের বাগান থেকে বিতাড়িত করবে।

পাঁচঃ আদমকে সতর্ককরণ
বেহেস্তের বাগানে শয়তান যখন তার পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে গ্যাব্রিয়েল(স্বর্গ থেকে ইডেনের বাগানের মধ্যকার সিঁড়ির পাহারাদার এঞ্জেল )চলে আসে। গ্যাব্রিয়েলকে দেখে শয়তান তাৎক্ষণিক সেই স্থান ত্যাগ করে। এদিকে গ্যাব্রিয়েল শয়তানকে বেহেস্তের বাগানে দেখে ফাদার অফ গড তথা ঈশ্বরকে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করে এরপর ঈশ্বর রাফেলকে(ঈশ্বরের বার্তা বাহক) আদম এর কাছে পাঠায় তাকে সাবধান করার জন্য। রাফায়েল এসে আদমকে বলে আদম তুমি কিছুতেই ফ্রুট অফ নলেজের ফল ভক্ষণ করবে না । আর তোমার আশেপাশের সকলের কথায় কর্ণপাত করবে না । কারণ এখানে যারা রয়েছে তারা সবাই তোমার ভালো চায়না কেউ কেউ সর্বদা তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ক্ষতি করার জন্য সর্বদা চেষ্টা করছে।

ছয়ঃ শয়তানের কৌশল গ্রহণ
সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে শয়তান এ সিদ্ধান্ত নেয় যে তার স্বাভাবিক আকৃতিতে আদম এবং ইভকে প্রতারিত করা সম্ভব নয়। কারণ প্রথমবার ইডেনের গার্ডেনে ঢোকার জন্য তাকে বাগানের দারোয়ানের সঙ্গে অনেক বিতর্ক করতে হয়েছে সেজন্য সে একটি কৌশলের আশ্রয় নেয়। কৌশলটি হলো সে নিজে একটি সাপের আকৃতি ধারণ করে ইভের নিকটে আসে এবং তাকে এই বলে প্ররোচনা করতে থাকে যে আমি এই স্বর্গের একজন বাসিন্দা কিন্তু আমার মনে খুব দুঃখ কারণ ঈশ্বর এই স্বর্গের বাগানের সবকিছুই তোমাদের ভোগ দখল করার অনুমতি দিয়েছে কিন্তু ফ্রুট অফ নলেজ বৃক্ষের ফল খাওয়ার অনুমতি দেয়নি? এর কারণ কি তুমি জানো? এর কারণ হলো তোমরা যদি এই বৃক্ষের ফল একবার খেয়ে ফেলো তাহলে ঈশ্বর আর কোনদিন তোমাদের এখান থেকে বের করতে পারবে না। তোমরা অমরত্ব লাভ করবে, উভয়ই চিরযৌবনা হয়ে যাবে,তুমি আরো অধিক সুন্দরী হয়ে যাবে এবং জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে । আর তোমরা চিরজীবী হয়ে যাও ঈশ্বর এটা চায় না। তাই ঈশ্বর তোমাদেরকে এই বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করেছেন । আমি তোমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী তাই তোমাকে একথাগুলো জানাতে এসেছি আমি চাই তোমরা এ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ কর এবং নিজেদের কে চিরজীবী, চিরযৌবনা করে সুখ স্বাচ্ছন্দে স্বর্গের বাগানে বসবাস করো। ইভ শয়তানের কথায় বিমোহিত হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে ফ্রুট অফ নলেজের ফল ভক্ষণ করে এর পরবর্তীতে ইভের কারণে আদম ও নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম